
অক্টোবরের মাঝামাঝি হলে কী হবে, ভোরের দিকে ‘শীত আসছে’ ব্যাপারটা বেশ টের পাওয়া যায়। আমি এখন পুঁথিগত বিদ্যা কাজে লাগিয়ে ইংরেজি সাহিত্য পড়ানোয় মন দিয়েছি। একটি ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। শীত আসছে–আসছে এমন আরামের দিনেও সকাল সাড়ে নয়টার ক্লাস নিতে ছুটতে হয়। কবিতা পড়ানোর সময় প্রায়ই ইংল্যান্ডের ইতিহাস উঠে আসে। ঘুম ঘুম চোখে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড থেকে ওয়েলস চলে যাই প্রায়ই। গুগলে ওয়েলস লিখে সার্চ করতেই একদিন ঢাকার এক বেকারির নিউজ সামনে এলো। বছর দুয়েক আগে বেকারি নিয়ে লিখেছি বলে এই ব্যাপারে বেশ আগ্রহ আছে। ঘেঁটেঘুঁটে দেখলাম, বেকারিটি বেশ পুরোনো। বয়স দেড় শ বছরের বেশি। সঙ্গে সঙ্গে মাথার মধ্যে ইংরেজি কবিতার সঙ্গে এই বেকারি ঘুরে দেখার পরিকল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
পরের দুই সপ্তাহ সময় পেলাম না। বাংলাদেশের ছুটির ক্যালেন্ডারের নিয়ম ভেঙে আমার সাপ্তাহিক ছুটি হয় বৃহস্পতিবার। তবে লাভ এটুকুই যে সেদিন অন্য সব অফিস খোলা থাকে বলে জরুরি কাজ সেরে ফেলা যায়। সামনের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন। নিজের সমাবর্তন বলে কথা! জরুরি সব কাজ তাই এই অক্টোবরেই গুছিয়ে ফেলছি। সার্টিফিকেটের কপি জমা দেওয়া, কোন শাড়ি পরব— সেটা ঠিক করা। এসব কাজেই বেরিয়েছিলাম এক বৃহস্পতিবার। পুরান ঢাকার সেই বেকারি ঘোরার কথা আগেই মাথায় ছিল, সময় পেয়ে ভাবলাম, এই তো সুযোগ! বেকারিটি লক্ষ্মীবাজারে। ডিপার্টমেন্টের এক ছোটভাই লক্ষ্মীবাজারে থাকে, ওকে বলেছিলাম গিয়ে একবার খোঁজ নিতে যে এত পুরোনো বেকারিটা আদৌ আছে কি না।
কিন্তু সে সময় করে উঠতে পারেনি। অগত্যা নিজেই চললাম। টিএসসি থেকে বাহন আমার রিকশা এবং সঙ্গী হলো গুগল ম্যাপ। কী জানি কেন, সেদিন প্রচণ্ড জ্যাম ছিল রাস্তায়। জ্যাম ঠেলেঠুলে বিকেল চারটার আগে পৌঁছানো যাবে কি না, এ নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল। গুগলে দেখাচ্ছিল চারটায় দোকানটা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে।
ভয়াবহ জ্যাম ঠেলে, প্রায় দুই ঘণ্টা পর লক্ষ্মীবাজার মোড়ে পৌঁছানো গেল। তবে অবাক করার মতো ব্যাপার হলো গুগলের দেখানো ঠিকানা, ‘৮০ মিউনিসিপ্যাল রোড’, স্থানীয় লোকজন কেউই চিনতে পারছিলেন না। শেষমেশ গুগল থেকে বের করে ছবি দেখালাম। বেকারিটা সবাই একবারেই চিনে গেল। এই এলাকায় বেশ সুপরিচিত। রাস্তার নাম চিনতে না পারার রহস্য হলো; রাস্তাটির নাম এখন ‘সুভাষ বোস অ্যাভিনিউ’।
বেকারিটা খুবই ছোট। খুঁজতে খুঁজতে যখন পেয়ে গেলাম, বেশ অবাকই হলাম। একদম ছোট মুদিদোকানের মতো। দোকানের বাইরে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। ভেতরে বেশ ভিড়। কাউন্টারে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে বিক্রি করছেন। যাঁর সঙ্গে কথা বলছেন, তিনি সম্ভবত পাশের কোনো এক স্কুল থেকে এসেছেন। সেখানে বাচ্চাদের ক্লাস পার্টির আয়োজন চলছে। আগামী রোববার দেড় শ পেস্ট্রির অর্ডার দিতে চান। খাস পুরান ঢাকার টান আছে ভদ্রলোকের কথায়।
মানুষের ভিড় ঠেলেই নিজের পরিচয় দিলাম। নয়তো আর দেওয়াই হতো না। এখানে আসার কারণও বললাম। ভীষণ ব্যস্ততা ছিল বলেই হয়তো ভদ্রলোক কথাই বলতে পারছিলেন না; কিংবা হয়তো আমাকে খানিক এড়িয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করছিলেন; কে জানে! মানুষের ভিড় একটু কমতেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘কাকা তো নাই। ঢাকার বাইরে গেছে। আপনি সোমবার আসেন। তাইলে উনারে পাইবেন।’ কাকাটি কে? এই প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল, তাঁদের অভিভাবক।
তিনিই এখন দোকান দেখাশোনা করেন। কাকার ফোন নম্বর চাইলাম। তা দিতে নারাজ। উপায় না পেয়ে সাইফুর ভাইকে ফোন করে সব কথা খুলে বললাম। তিনি ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বললেন। ভদ্রলোক দেখলাম ফোনে দিব্যি রাজি হয়ে গেলেন! ফোন রাখতেই আবার সেই এক কথা—কাকার নম্বর দেওয়া যাবে না। অবশেষে অনেক দূর থেকে এসেছি ইত্যাদি বলে নম্বর পাওয়া গেল। শর্ত হলো তিনি যে নম্বরটি আমাকে দিয়েছেন, এই খবর যেন কাকা সম্বোধনের ব্যক্তি কোনোমতেই জানতে না পারেন। এই ভীতু ভদ্রলোকের নাম কায়সার। চলে আসব, তার আগে ডেকে বসিয়ে একটা চকলেট পেস্ট্রি অফার করলেন।
খেয়ে দেখলাম, কেকটা মাত্র ৩০ টাকার তুলনায় খেতে বেশ ভালো। খাচ্ছি, হঠাৎ এক ভদ্রলোক এলেন বাটার বান কিনতে। বাটার বান হতে এখনো বেশ দেরি হবে শুনে মন খারাপই করলেন। বারবার বলতে লাগলেন , ‘সকাল থিক্কা কিছু খায় নাইক্কা। উপোস দিছে। চা দিয়া খাইব হালায়।’ আবারও সেই পুরান ঢাকাইয়া টান। আমার বেশ মজা লাগল। ভাবলাম, একটু কথা বলেই দেখা যাক। ভদ্রলোকের নাম শাহাবুদ্দিন। তিনি জানান, তাঁর ছেলের বউ রেহানা সকালে কিছু খেতে পারে না। তাই এখানকার বাটার বান সে চায়ে ডুবিয়ে খায়। এটা তার প্রিয় খাবার। আরও জানতে পারলাম, প্রায় ৩৫ বছর আগে চাকরির সূত্রে এখানে আসেন শাহাবুদ্দিন। তখন থেকেই এই দোকানের নিয়মিত খদ্দের তিনি। কায়সার সাহেবকে পেস্ট্রির জন্য ধন্যবাদ দিয়ে আমি রওনা দিলাম বাসার উদ্দেশে।
দিন দুয়েক পরে একদিন ক্লাসের ব্রেকে দোকানের স্বত্বাধিকারী ভদ্রলোককে ফোন করি। ভদ্রলোকের নাম মাহবুবুর রহমান। গলার স্বর শুনে মনে হলো, ষাটোর্ধ্ব বয়স। তিনি প্রথমে শনিবার যেতে বললেও পরে সোমবার যাওয়ার কথাই পাকা হলো। আমার জন্য অবশ্য বেশ সুবিধাই হলো। সোমবার থেকে পূজার ছুটি শুরু। আমি অনেকটাই আরামে দিন কাটাব।
সোমবার দুপুর ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম বাবুল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি দোকানেই ছিলেন। ছোট্ট দোকানে প্লাস্টিকের টুলে বসতে দিলেন। কথা শুরু করলেন এই বেকারির ইতিহাস দিয়ে। বেকারির নাম শোনার পর থেকেই ভাবছিলাম যে হয়তো তৎকালীন প্রিন্স অব ওয়েলস একবার ঢাকা সফরে এসে এই বেকারি পরিদর্শনে এসেছিলেন। এরপরই নাম বদলে এই নাম রাখা হলো। বাবুল সাহেব বললেন ভিন্ন কথা।
জনৈক ইংরেজ ভদ্রলোক, যিনি এই বেকারির গোড়াপত্তন করেন, তিনি ছিলেন ওয়েলসের বাসিন্দা। এই দেশে এসেছিলেন চাকরিসূত্রে। তখন এই এলাকায় খ্রিষ্টান বসতি ছিল বেশি। সম্ভবত ১৮৫০ সালে এই বেকারির জন্ম। এই বেকারির কাছেই ঢাকার নামকরা স্কুল সেন্ট গ্রেগরী। সেন্ট গ্রেগরী স্কুল ও গির্জারও অনেক আগে এই বেকারি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই হিসাবে ১৮৭০ সালে এই বেকারির জন্ম হয়েছে, এ কথাও শোনা যায়। বাবুল সাহেবের ভাষ্যমতে, ইংল্যান্ডের রাজা হওয়ার আগের ধাপ হচ্ছে ওয়েলসের রাজপুত্র হওয়া। তার মানে ওয়েলসের রাজপুত্র সবার আগে। তাই এই এলাকার সবচেয়ে পুরোনো বেকারির নাম নাকি প্রিন্স অব ওয়েলস! মনে মনে ভাবলাম, ‘লক্ষ্মীবাজারের রাজপুত্র হলেও মন্দ হতো না!’
আরও জানা গেল জনৈক ইংরেজ ভদ্রলোক ইংরেজদের বড়দিন আর বিয়েতে কেকের চাহিদার কথা চিন্তা করে বেকারি খুললেও ধীরে ধীরে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেক তৈরির কাজে নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা কেক তৈরি করতে পারত না ঠিকই, তবে রুটি বানাতে তো জানতই! যদিও ভেতো বাঙালি বলে কথা! রুটি বানানোর বিদ্যা কাজে লাগিয়েই কেক তৈরিও আয়ত্ত করে ফেলল দ্রুত। এই কারিগরদের মধ্যেই একজন ছিলেন বদরুদ্দোজা আহমেদ। ১৯১০ সালে ইংরেজ ভদ্রলোক এই দেশ ত্যাগ করেন। তার আগে ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’ বেকারি বুঝিয়ে দিয়ে যান বিশ্বস্ত কর্মী বদরুদ্দোজাকে।
বর্তমানে তাঁর উত্তরাধিকারিরাই এই বেকারি সামলাচ্ছেন। মাহবুবুর রহমান মাতৃসূত্রে বদরুদ্দোজা আহমেদের আত্মীয়। তিনি জানান, তাঁর ৬৮ বছরের জীবনের ৫০ বছরই তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন এই বেকারিতে। বদরুদ্দোজার ছেলেরা সবাই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন বহুবছর আগে। তাঁর নাতিরা কেউ কেউ আছেন। জানা গেল, কায়সার সাহেব বদরুদ্দোজা আহমেদরই নাতি। মাহবুবুর বাবুল সাহেবের ছেলের মতো।
এলাকায় এত খ্যাতি থাকার পরও দোকানটি কেবল এতটুকু জায়গায় কেন জানতে চাইলাম। হেসে বললেন, এই দোকান এখন কেবলই কালের সাক্ষী। দেখে রাখার কেউ নেই। আমার পরে হয়তো দেখভালের জন্য কেউ থাকবেও না। অনেক যুগের অনেক ঘটনার সাক্ষী এই দোকান। দেশভাগ, দাঙ্গা ও মুক্তিযুদ্ধ। আরও জানালেন, মুক্তিযুদ্ধের পর প্রায় বছর পাঁচেক দোকানটি বন্ধ ছিল। ১৯৭৬ সাল থেকে আবার এর বেচাকেনা শুরু হয়। এই বেকারি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, জানি না। আমার পরে দেখার মতো কেউ নেই। আমি নিজেই এখন হাজার রোগে জর্জরিত। প্রিন্স অব ওয়েলসও মৃতপ্রায়। করোনা অতিমারির সময় কর্মচারীর বেতন দিতে না পেরে দোকানের কর্মচারী সংখ্যাও কমিয়ে মাত্র ১৫ জনে নিয়ে এসেছেন।
কোন খাবারটি সবচেয়ে জনপ্রিয় জানতে চাইলে বললেন, ফ্রুটকেক। ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে কেন জানি কেকের ঘ্রাণ পেলাম। জানা গেল, এর ভেতরই কেক তৈরি হয়। শাহাদাত নামের এক ভদ্রলোক এই দোকানেরই কর্মচারী। ১৫ বছর থেকে এখানে আছেন। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন দেখাতে। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লাগল বার্নারটি। একটিই বার্নার। এটি নাকি অনেক অনেক আগে থেকে এখানেই আছে। এর আসল বয়স কেউ জানে না। পাশেই তৈরি হচ্ছে কেক। মাখা হচ্ছে খামির।
ফিরে এলাম। কারও কাজে বেশিক্ষণ বিরক্ত করা আমার স্বভাব না। কাজ করছে করুক। বড়দিনের সময়টায় নাকি এখনো এই বেকারি তার হারানো জৌলুশ ফিরে পায়। সবচেয়ে জনপ্রিয় কেকের নাম আবার ‘লাভ লেটার’! এটি একধরনের কেক, যার ভেতরে লেমন ফ্লেভারড ফিলিং থাকে। আরও আছে চিজ কেক আর জ্যাম টার্ট। জ্যাম টার্টটা দোকানেই ছিল। দেখতে বেশ মজার। টার্ট যেমন হয়, ঝুড়ির মতন। মাত্র ২০ টাকা থেকে আজও এখানে খাবারের দাম শুরু হয়। সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা পাউন্ড হয় ফ্রুট কেকের।
এখানে নাকি আগে বার্নারে নিজেদের কেক বানিয়ে নেওয়ার রীতিও ছিল। এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের চিনি, ময়দা ও তেল নিয়ে এসে এখানকার বার্নারে পছন্দমতো কেক বানিয়ে নিতেন। বড়দিনের কেকের অর্ডারও নাকি দিতে হতো একেবারে ডিসেম্বরের শুরুতেই। নাহলে ঝক্কি পেরিয়ে দাঁড়াতে হতো লম্বা লাইনে। সেই ঝুঁকি নিতে চাইতেন না কেউ। কথায় কথায় এ-ও জানতে পারলাম, রানি এলিজাবেথ নাকি একবার ঢাকায় এসেছিলেন। যখন তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তখন এই বেকারির নামও ছিল।
কাজ শেষে উঠে যাচ্ছি, বাবুল সাহেব ডেকে থামালেন। ডিসেম্বরে বড়দিনের ঠিক আগে আগে যাওয়ার নিমন্ত্রণ পেলাম। তাঁদের ফ্রুট কেকের স্বাদ নাকি একবার খেলে মুখে লেগে থাকার মতো। লক্ষ্মীবাজার থেকে শাঁখারী বাজার মিনিট দশেক হাঁটার রাস্তা। পূজার সময় এ জায়গাটি বেশ দেখার মতো হয়। ভাবলাম, এত দূর এসেছিই যখন, একবার ঘুরে যাওয়া যাক। হেমন্তের বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা আর চুলায় পুড়তে থাকা কেকের ঘ্রাণ নিয়ে আমি আবার রিকশায় চেপে বসি। ফাঁকা রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা শাঁই শাঁই করে ছুটে চলে শাঁখারী বাজারের দিকে।
লেখক: এআইবিউটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক