
যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যেতে পারে। অন্তত জনমত জরিপে এমনটাই আভাস দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি হলেও নিজের কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চান রিপাবলিকানদলীয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে জন্য নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের ছক কষছে হোয়াইট হাউস। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সম্ভাব্য তদন্ত মোকাবিলারও প্রস্তুতি চলছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ও পরিকল্পনার বিষয়ে জানেন এমন দুজন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমন তথ্য জানিয়েছেন। তাঁরা নাম প্রকাশ করেননি। গত এপ্রিল থেকেই এ প্রস্তুতি চলছে।
.
গত দুই বছরে ট্রাম্প মূলত কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে চলেছেন।…কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।
নাথান গঞ্জালেস, সম্পাদক, ইনসাইড ইলেকশনস
.
আগামীকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এতে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সব, তথা ৪৩৫টি আসন এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ ৩৫ আসনে ভোট হবে। বিভিন্ন জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে সিনেটে দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সিনেটে দুই দলের আসনসংখ্যা যথাক্রমে ৫৩ ও ৪৭। দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের আসন ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদে আরও চারটি এবং সিনেটে আরও চারটি আসনে জয় পেতে হবে। অধিকাংশ জরিপের পূর্বাভাস, ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে তা সম্ভব হতে পারে।
হোয়াইট হাউস অবশ্য রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আশঙ্কাকে সংবাদমাধ্যমের ভুল বয়ান বলে দাবি করেছে। একইভাবে তারা সীমান্ত সুরক্ষা ও মানুষের আর্থিক স্বস্তি আরও বৃদ্ধির কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছে।
.
প্রস্তুতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আছেন হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার ও বাজেট পরিচালক রাসেল ভোট। নতুন কোনো আইন ছাড়াই ট্রাম্প কী কী পদক্ষেপ নিতে পারবেন, সেটার নানা দিক তাঁরা আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে খতিয়ে দেখছেন। এ প্রস্তুতির বিষয়ে ট্রাম্পকে জানানো হয়েছে। তিনিও এসব আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের টারবাইন আমদানিতে নতুন শুল্ক আরোপ। বিদেশি শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের ভিসার শর্ত আরও কঠোর করা হতে পারে। আবাসন ও নির্মাণব্যয় কমানোর পদক্ষেপও বিবেচনায় রয়েছে।
কংগ্রেস এরই মধ্যে যেসব খাতে অর্থ বরাদ্দ করেছে, সেসব অর্থ ব্যবহার করে নতুন কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখছেন বাজেট পরিচালক রাসেল ভোট। সরকারি অনুদান দেওয়ার নিয়মও তিনি বদলাতে চান। এতে কোন প্রকল্প অর্থ পাবে, তা নির্ধারণে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে পারে।
দ্বিতীয় মেয়াদে শুল্ক আরোপ, অভিবাসন অভিযান, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে কর্মী ছাঁটাই এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন ট্রাম্প। তবে বড় ধরনের কর ও ব্যয় হ্রাসের প্যাকেজ বাস্তবায়নে তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়েছেন।
নির্দলীয় বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ইনসাইড ইলেকশনসের সম্পাদক নাথান গঞ্জালেসের মতে, গত দুই বছরে ট্রাম্প মূলত কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে চলেছেন। নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে যতটা সম্ভব কাজ করেছেন। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।
.
রিপাবলিকানরা কংগ্রেস হারলে প্রথমে এক–দুই মাস ভেটো দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। পরে হয়তো সমঝোতা হবে। নিউইয়র্ক পোস্টের পডকাস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘মনে হয় আমি মিস্টার ভেটো হয়ে যাব।’
ভেটো হলো কোনো বিলে অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠানোর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা। তা অগ্রাহ্য করতে কংগ্রেসের দুই কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটদের সেই শক্তি অর্জনের সম্ভাবনা কম।
ট্রাম্প এরই মধ্যে নতুন আইন ছাড়াই পদক্ষেপ নিতে বারবার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। কংগ্রেস তা বাতিলের উদ্যোগ নিলেও তিনি ভেটো দিতে পারেন।
.
তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের কংগ্রেসের তদন্তের মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প নিজের, তাঁর মিত্রদের বা নির্বাচনী প্রচারের দাতাদের সুবিধা দিয়েছেন কি না, তা তদন্তের বিষয়ে প্রতিনিধি পরিষদের জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাটরা এরই মধ্যে আলোচনা শুরু করেছেন।
ডেমোক্র্যাটরা শুনানি করতে পারবেন। নথি চাইতে পারবেন। সমনও জারি করতে পারবেন। সমন হলো সাক্ষ্য বা নথি দেওয়ার আনুষ্ঠানিক তলব। হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরা কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য এ পরিস্থিতি মোকাবিলার পরামর্শ দিচ্ছেন। লিখিত বক্তব্যে সতর্ক থাকতে বলেছেন।
ব্যক্তিগত উপদেষ্টাদের সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ তদন্তের বাইরে রাখার আইনি সুযোগও খোঁজা হচ্ছে। এ জন্য বিচার বিভাগের মতামত চাওয়া হয়েছে।
.
কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প–সমর্থিত আইন আটকে দিতে পারবেন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট তাঁর আইনি ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে কোনো পদক্ষেপ নিলে আদালত তা বন্ধ করে দিতে পারেন।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে বিচারপতি ও প্রশাসনের উচ্চ পদে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টিও এই আওতায় পড়বে।
টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের জননীতি বিভাগের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু বুশ বলেন, ‘আমার ধারণা প্রেসিডেন্টের যেকোনো নিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদনে তাঁদের খুব অনীহা থাকবে।’