
কিছু বিদায় আসে একটু পরে, কিন্তু বিদায়ের আভাস মেলে অনেক আগেই।
একটা মানুষ তখনো মাঠে নামেন, গোল করেন, জয়ের পর দুই হাত ছড়িয়ে উদ্যাপন করেন। গ্যালারি থেকে তাঁর নামে চিৎকার ওঠে। কিন্তু কোথাও একটা সময়ের শেষ হয়ে আসার শব্দ বাজতে থাকে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল-জীবনেও হয়তো সেই শব্দটা অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। এবার নিজেই জানিয়ে দিলেন, জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটা ফিরিয়ে দেওয়ার সময় হয়েছে।
একটা জার্সির সঙ্গে কত স্মৃতি জমা হতে পারে? কত আনন্দ, কত কান্না, কত অপেক্ষা! ২৩ বছর ধরে পর্তুগালের জার্সি গায়ে রোনালদো এসবের সব কটিই দেখেছেন। কিশোর বয়সে যে ছেলেটি জাতীয় দলে এসেছিলেন, তিনি একদিন হয়ে উঠেছেন দেশের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকা। তাঁর পায়ের জাদুতে পর্তুগাল যেমন আনন্দে ভেসেছে, তেমনি তাঁর চোখের জলও দেখেছে পুরো বিশ্ব।
২০০৩ সালের ২০ আগস্ট কাজাখস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের হয়ে অভিষেক হয়েছিল ১৮ বছর বয়সী রোনালদোর। তখনো তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হয়ে ওঠেননি। ছিলেন সম্ভাবনাময় এক তরুণ, যাঁর চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন। পরের বছরই ঘরের মাঠে ইউরোতে সেই তরুণের প্রথম বড় পরীক্ষা। গ্রিসের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে গোল করলেন। সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গোল করে দলকে ফাইনালেও তুললেন। কিন্তু ফাইনালে আবার সেই গ্রিস। ১-০ গোলে হেরে গেল পর্তুগাল। ম্যাচ শেষে কিশোর রোনালদোর চোখের জল দেখে সেদিন অনেকেই বুঝেছিলেন, তাঁর কাছে দেশের জার্সির অর্থ কতটা।
.
সেই কান্নার পরও পথটা সহজ হয়নি। ২০০৬ বিশ্বকাপে পর্তুগাল উঠেছিল সেমিফাইনালে। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ হয়ে ফিরতে হয়েছিল। ২০০৮ ইউরোতে বিদায় কোয়ার্টার ফাইনালে। ২০১০ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো, ২০১২ ইউরোতে সেমিফাইনাল। একের পর এক টুর্নামেন্টে রোনালদো বড় তারকা হয়ে উঠেছেন, গোল করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন। কিন্তু দেশের হয়ে বড় শিরোপা তখনো অধরা।
.
এর মধ্যে বদলে গেছে তাঁর পরিচয়ও। একসময় লুইস ফিগোদের পাশে দাঁড়ানো তরুণ রোনালদো হয়ে উঠেছেন পর্তুগালের অধিনায়ক। দলের আশা–ভরসা, সবচেয়ে বড় নাম। তাঁর ওপর প্রত্যাশার ভারও বেড়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় সেই ভার আরও বাড়িয়েছিল। ২০১৬ ইউরোতে তাই পর্তুগালের সামনে ছিল বহু বছরের অপেক্ষা শেষ করার সুযোগ।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল। কিন্তু ম্যাচের ২৫ মিনিটের মাথায় চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হলো অধিনায়ককে। সাইডলাইনে বসে সতীর্থদের জন্য চিৎকার করছিলেন তিনি। কখনো উঠে দাঁড়াচ্ছেন, কখনো হাত নেড়ে নির্দেশ দিচ্ছেন। মাঠে খেলতে না পারলেও দলকে ছেড়ে যাননি। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে এদেরের গোলে ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরো চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল। রোনালদোর চোখে তখন আনন্দের জল। ১২ বছর আগে যে ছেলেটি ইউরোর ফাইনালে হেরে কেঁদেছিলেন, সেদিন সেই তিনিই দেশের প্রথম বড় শিরোপা জয়ের আনন্দে কাঁদলেন।
.আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেন রোনালদো .
সেই রাত যেন রোনালদোর পর্তুগাল-জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তর। তবে গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি। ২০১৯ সালে নেশনস লিগের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আরেকটি শিরোপা জেতে পর্তুগাল। ২০২৫ সালে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান রোনালদো। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জেতে পর্তুগাল। বয়স তখন তাঁর ৪০ পেরিয়েছে। তবু দেশের জার্সিতে গোল করার ক্ষুধা কমেনি।
.
বিশ্বকাপের গল্পটা অবশ্য অন্য রকম। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন রোনালদো। ২০০৬ সালে সেমিফাইনাল পর্যন্ত গেলেও আর কখনো ফাইনালে ওঠা হয়নি। ২০১০ ও ২০১৮ সালে শেষ ষোলো থেকে বিদায়, ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্বেই শেষ, ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল। ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই অপূর্ণতা ঘোচেনি। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সর্বোচ্চ ১৪ গোল, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড, ছয়টি বিশ্বকাপে খেলার ইতিহাস, সবই তাঁর। কিন্তু বিশ্বকাপ হাতে তোলার ছবিটি আর পাওয়া হলো না।
রোনালদোর পর্তুগাল-জীবনে শেষের দিকটাও ছিল কিছুটা অস্বস্তির। কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, দলে নিজের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ, সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে ও মাঠের বাইরে কিছু মুহূর্ত, এসব আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোচের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব দিয়ে ২৩ বছরের গল্পকে মাপা যায় না। একটি দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকতে পারে। তাতে মুছে যায় না দেশের হয়ে তাঁর দেওয়া অসংখ্য আনন্দের মুহূর্ত।
.একটি দৃশ্য আমি সারা জীবন সঙ্গে নিয়ে যাব—বিদায়ী বক্তব্যে রোনালদো.
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া ভিডিও ও চিঠিতে রোনালদো লিখেছেন, ‘জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার দিন এসে গেছে। কখনো ভাবিনি, জার্সিটি শুধু আমারই। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব দুটিই পেয়েছি।’ কথাগুলোয় যেন লুকিয়ে আছে একটি পুরো জীবন। যে জার্সি গায়ে প্রথম মাঠে নেমেছিলেন, সেই জার্সিই একদিন ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। মাঝখানে কতগুলো বছর, কতগুলো ম্যাচ, কতগুলো গোল, কতগুলো রাত!
.
পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন রোনালদো। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার এবং সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড তাঁর। সংখ্যাগুলো একদিন হয়তো আরও পুরোনো হবে। কেউ হয়তো গোলের রেকর্ড ভাঙবেন, ম্যাচের রেকর্ডও পেরিয়ে যাবেন। কিন্তু পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে রোনালদোর জায়গাটা শুধু সংখ্যায় লেখা থাকবে না।
.সবচেয়ে বেশি ম্যাচ, সবচেয়ে বেশি গোল—আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর আরও রেকর্ড.
কারণ, তিনি শুধু গোল করেননি। এক প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। যে দেশ ২০০৪ সালে ঘরের মাঠে ইউরোর ফাইনালে হেরেছিল, সেই দেশকে ১২ বছর পর ইউরোপের সেরা হতে দেখেছেন। যে ছেলেটি একদিন কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছিলেন, তিনি একদিন পর্তুগালের হাতে তুলে দিয়েছেন দেশের ইতিহাসের প্রথম ইউরো ট্রফি। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে একটি দেশের ফুটবল-আবেগ, প্রাপ্তি আর অপেক্ষার গল্প।
.
এখন থেকে পর্তুগালের মাঠে ৭ নম্বর জার্সি গায়ে অন্য কেউ নামবেন। গোল হলে গ্যালারি আবারও উল্লাস করবে। নতুন কোনো তারকা জন্ম নেবেন। কিন্তু গোলের পর দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়ানো সেই মানুষটিকে আর দেখা যাবে না। পর্তুগালের জার্সিতে তাঁর দৌড় থামবে, গোল থামবে, উদ্যাপনও থামবে। শুধু থেকে যাবে ২৩ বছরের স্মৃতি।
কিছু জার্সি শুধু শরীরে পরা হয় না, হয়ে ওঠে একটি দেশের পরিচয়। পর্তুগালের ৭ নম্বর জার্সিটি তেমনই। রোনালদো জার্সিটি ফিরিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষটিকে কি আর ফিরিয়ে দেওয়া যায়?
.রোনালদোর উত্থান, অর্জন ও বিদায়: ১৫ ছবিতে এক কিংবদন্তির গল্প