
রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে একক প্রচেষ্টার বদলে চীন, আসিয়ান, জাতিসংঘ, জাপানসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে একটি কৌশলগত আঞ্চলিক জোট গড়তে চায় বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রোববার ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট: টেকসই প্রত্যাবাসন এবং একটি স্থায়ী আঞ্চলিক সমাধানের অভিমুখে ভবিষ্যৎ কার্যপন্থা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। ‘ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ (এফএসডিএস) এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সম্প্রতি জাপান সরকারের মিয়ানমারবিষয়ক জাতীয় পুনর্মিলনসংক্রান্ত বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়া বাংলাদেশ সফর করেছেন জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তাঁর আলোচনা হয়েছে। নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে তিনি নিজেও আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে জাপান সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
চলতি মাসের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের কথা রয়েছে, যেখানে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে আরও আলোচনা হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেখানে আইনি সরকারের পাশাপাশি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরাকান আর্মি। ফলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগসহ নানামুখী কূটনৈতিক মাধ্যম ব্যবহার করে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনই মূল লক্ষ্য। চূড়ান্ত বিকল্প হিসেবে সব পথ উন্মুক্ত রেখেই বাংলাদেশ কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখবে।
এফএসডিএসের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রীর পদমর্যাদা) ইসমাইল জবিউল্লাহ।
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক সমস্যা বা দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়; এটি জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এখন সংকট ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে কৌশলগত কূটনীতিতে জোর দিতে হবে।
অস্থায়ী ত্রাণ সহায়তার বদলে টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে উল্লেখ করে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে নিতে হবে সমন্বিত জাতীয় কৌশল। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এ বছর বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রত্যাবাসন ইস্যুটি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ বের করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।সেমিনারে বিষয়ভিত্তিক তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। মিয়ানমার ও রাখাইনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট নিয়ে অধ্যাপক এ এস এম আলী আশরাফ; রাখাইনের উন্নয়ন, কানেক্টিভিটি ও প্রত্যাবাসন বিষয়ে অধ্যাপক শাহাব এনাম খান এবং আঞ্চলিক কূটনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত পথ নিয়ে প্রস্তাবনা তুলে ধরেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফায়াত আহমদ।
আলোচনায় বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, প্রত্যাবাসন কেবল মানুষের শারীরিক পুনর্বাসন নয়; বরং ফেরত যাওয়া নাগরিকদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, বাসস্থান, জীবিকা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির মতো অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাই টেকসই সমাধানের মূল চাবিকাঠি।
সেমিনারে দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।